আটরশির মূল পীর হলেন শাহসূফী হযরত হাশমত উল্লাহ। জামালপুর জিলার • অন্তর্গত শেরপুর থানাস্থ পুকুরিয়া নামক গ্রামে তার জন্ম। তার পিতার নাম শাহ আলীম উদ্দিন। তার আরবী, ফার্সীর প্রাথমিক শিক্ষা মাওলানা শরাফত আলী , নােয়াখালীর কাছেই অর্জন হয়। তার নিয়মতান্ত্রিক লেখাপড়ার ইতিহাস এতটুকুই পাওয়া যায়। তার পীর হলেন, শাহসূফী ইউনূস আলী এনায়েতপুরী। আটরশির পীর দীর্ঘ ত্রিশ বৎসর যাবৎ এনায়েতপুরীর সংস্রবে থাকেন এবং তার নিকট হতে খিলাফত লাভ করেন। তারপর এনায়েতপুরীর নির্দেশে বর্তমান ফরিদপুর শহরের নিকটস্থ আটরশি বিশ্ব জাকের মঞ্জিল স্থাপন করেন। আটরশির বর্তমান গদিনশিন পীরজাদার নাম মােস্তফা আমীর ফয়সাল মুজাদ্দেদী। তিনি নিয়মতান্ত্রিক লেখাপড়া করা কোন আলেম নন। বরং একজন কলেজ শিক্ষিত ব্যক্তি।
আটরশির আকীদা-বিশ্বাস নং-১
আল্লাহকে পেতে মুসলমান হওয়ার কোন প্রয়ােজন নেই। আটরশির গ্রন্থ “তাসাউফ ও ততুপর্যালােচনা’র” ১৪৭ নং পৃষ্ঠায় লিখেছে। “হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ প্রত্যেকেই নিজ নিজ ধর্ম থেকেই আল্লাহ্কে পেতে পারে। পীরের কাছে মুরীদ হলেই চলবে।” ‘আটরশির কাফেলা’ নামক গ্রন্থের ৮৯নং পৃষ্ঠায় আরও লিখেছে “হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ ও খৃষ্টানগণ নিজ নিজ ধর্মের আলােকেই সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করতে পারে। এজন্য আটরশির পীর ওরশের সময় প্রায় ৪০ হাজার অমুসলিম জাকেরানের জন্য আলাদা একটি প্যান্ডেল তৈরি করে।(প্রমাণঃ আটরশির কাফেলা, পৃষ্ঠা- ৬২)।
তার বিপক্ষে দলিলঃ। আটরশির এই আকিদা সম্পূর্ণ কুরআন-সুন্নাহ পরিপন্থী ও কুফুরী আকিদা। কারণ, আল্লাহ রাব্বল আলামীন ইসলাম ধর্মকেই সর্বোত্তম গ্রহণযােগ্য দ্বীন হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং নিজের সকল বান্দাদের জন্য তা পছন্দ ও মনােনয়ন করেছেন। বিশ্বমানবের একমাত্র এটাই শান্তি ও মুক্তির ধর্ম। এটাই সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ট ধর্ম। কিয়ামত পর্যন্ত আর কোন নতুন দ্বীন প্রবর্তনের অবকাশ নেই। অতএব, কিয়ামত পর্যন্ত সকলের কাছে এই সুমহান দ্বীনই অনুসৃত ও প্রতিপালিত হবে। এ মর্মে কুরআন শরীফে ইরশাদ হচ্ছেঃ
ورضيت لكم الإسلام دينا
অর্থঃ আমি ইসলামকেই তােমাদের ধর্ম হিসেবে মনােনিত করলাম (সূরা মায়িদা, আয়াত: ৩) কুরআনে পাকের অন্যত্র বলা হচ্ছেঃ
ان الدین عبد الله الإسلام
অর্থঃ নিশ্চই আল্লাহর নিকট গ্রহণযােগ্য একমাত্র ধর্ম হচ্ছে ইসলাম। (সূরা আলে-ইমরান আয়াতঃ ১৯)। সুতরাং আল্লাহ তাআলার নিকট একমাত্র ইসলামই সত্য সঠিক ধর্ম হিসেবে মনােনীত। তাই তিনি বিশ্ববাসীকে সম্বােধন করে কুরআনে পাকে ইরশাদ করেছেন
وأنتم مسلمون ولا تموت
তােমরা মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করাে না। (সূরা আলে-ইমরান, আয়াত: ১০২)
আল্লাহ তাআলা আরাে বলেন
,
ومن يبتغ غير الإسلام دينا فلن يقبل منه وهو في الأخرة من الخيرون.
“যে ব্যক্তি ইসলাম ব্যতিত অন্য কোন ধর্ম সন্ধান করবে আল্লাহ্ তাআলার নিকট তাহার সেই ধর্ম কখনই গ্রাহ্য হবে না। আর সেই ব্যক্তি পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভূক্ত হবে।” (সূরা আলে-ইমরান, আয়াত: ৮৫) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেন।
وتی کتبع ولو كان حيا و درک
অর্থঃ যদি তিনি (হযরত মুসা আঃ) জীবিত থাকতেন এবং আমার নবুওয়াতের সময় কাল পেতেন, তবে নিশ্চয় তিনি আমার অনুসরণ করতেন। (মিশকাত: ২৩) উপরােক্ত আলােচনায় বুঝা যায় যে, ইসলামই হচ্ছে সকল দ্বীন-ধর্মের মাঝে একমাত্র গ্রহণযােগ্য ও মুক্তির ধর্ম। ইসলামই হচ্ছে পূর্বেকার সকল ধর্ম ও মতবাদকে রহিতকারী। সুতরাং যদি কেউ বিশ্বাস করে যে, ইসলাম ব্যতিত অন্যান্য ধর্মের লােকেরাও নিজ নিজ ধর্মের আলােকে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পারে এবং মুক্তি পেতে পারে। তাহলে সে এ সকল আয়াত অস্বীকারকারী গণ্য হয়ে কাফের হয়ে যাবে।
আটরশির আকীদা-বিশ্বাস নং- ২
আমাদের নবী (সাঃ) অপরিপূর্ণ নবী ছিলেন। আটরশি পীরের নসীহত বই “খােদা প্রাপ্তি জ্ঞানের পথে”র ৩নং খন্ডের ৪১ নং পৃষ্ঠায় লিখেছে, আমাদের নবী (সাঃ) প্রথমে পরিপূর্ণ নবী ছিলেন না। পরবর্তিতে এক হাজার বছর পরে আল্লামা আহমদ ছিরহিন্দীর (রহ.) মাধ্যমে রুহানী, ফয়েজ বরকতে পূর্ণতা লাভ হয়েছে।
তার বিপক্ষে দলিলঃ আটরশির এই মতবাদ সম্পূর্ণ কুরআন-হাদীস বিরােধী। কেননা, সহীহ্ আকীদা * হল, হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) হলেন সর্বশ্রেষ্ট ও সর্বশেষ পরিপূর্ণ নবী। স্বয়ং আল্লাহপাক তাকে ‘খাতামুন নাবিয়্যীন’ সর্বশেষ পরিপূর্ণ নবী বলে আখ্যায়িত করেছেন। আল্লাহপাক বলেন,
ماکان محمد ابا احد من رجالكم ولكن رسول اللو وخاتم البين
অর্থঃ মুহাম্মদ (সাঃ) তােমাদের কোন পুরুষ লােকের পিতা নন বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী। (সূরা আহযাব, আয়াত: ৪০) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,
انا خاتم التبين لا نبی بعدی
“আমিই শেষ নবী আমার পরে কোন নবী নেই।” (খাতমুন শব্দের এক অর্থ। সীলমােহর, উপসংহার, সমাপ্তি । কোন কিছুতে সীলমােহর তখনই অঙ্কিত করা হয়। যখন তা পরিপূর্ণ বা সমাপ্ত হয়ে যায়। অতএব, হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কে সর্বশেষ পরিপূর্ণ নবী বিশ্বাস করা ঈমানের অঙ্গ। নতুবা আল্লাহর কালাম এবং আল্লাহ। পাককেই অবিশ্বাস করা হবে। আল্লাহ তাআলা আরাে ইরশাদ করেন,
وما ارسلناک الا رحمة للعالمين
অর্থঃ আমি আপনাকে সারা বিশ্বের পরিপূর্ণ রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছি।(সূরা আম্বিয়া, আয়াত: ১০৭) রাসূল (সাঃ) ইরশাদ করেন
بعثت لأتمم مكارم الأخلاق
অর্থঃ উত্তম চারিত্রিক গুণাবলি পরিপূর্ণ করার উদ্দেশ্যে আমি প্রেরিত হয়েছি। সুতরাং উল্লিখিত কুরআন ও হাদীসের বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত হল, আমাদের নবী (সাঃ) পরিপূর্ণ নবী ছিলেন। অতএব, যারা নবী (সাঃ) কে অপরিপূর্ণ বলে উম্মতের একজন বুযুর্গের মুখাপেক্ষী করে তার পূর্ণতার আকিদা পােষণ করে, তারা মুসলমান থাকতে পারে না। পীর হওয়াতাে প্রশ্নই উঠে না।
আটরশির আকীদা-বিশ্বাস নং- ৩
আটরশি পীর ধনী করার মালিক। আটরশি পীরের অনুসারী বা এজেন্টরা বলে বেড়ায় যে, আটরশির মুরীদ হলে অভাব-অনটল থাকে না ধনী হওয়া যায়। এজন্য অনেকে আটরশি পীরের ওরশে যায়।
তার বিপক্ষে দলিলঃ। আল্লাহ ছাড়া কোন পীর, ওলী, বাবা যাকে ইচ্ছে ধনী বানাতে পারে যাকে ইচ্ছে গরীব বানাতে পারে এসব ধারণা ঈমান বিধ্বংসী শিরকী। কেননা, আল্লাহপাক স্পষ্ট ভাষায় কুরআনে বলেন, ,
قل ان ربی یبسط الرزق لمن يشاء من عباده ويقدره
অর্থঃ হে নবী! আপনে বলে দিন, নিশ্চই আমার পালনকর্তা তার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা রিযিক বাড়িয়ে দেন এবং সীমিত পরিমাণে দেন। (সূরা সাবা, আয়াত: ৩৯)
অর্থঃ এবং তিনিই (আল্লাহ) ধনবান করেন ও সম্পদ দান করেন (সূরা নাজম, আয়াত: ৪৮)
وانه هو اغني واقني وترزق من تشاء بغير حساب
অর্থঃ তুমিই (আল্লাহ) যাকে ইচ্ছা বে-হিসাব রিযিক দান কর। (সূরা আল-ইমরান, আয়াত: ২৭) সারাংশ কথা হচ্ছে, আল্লাহ তাআলা যাকে ইচ্ছে ধনী বানান, যাকে ইচ্ছে গরীব
বানান। এই ক্ষমতা আল্লাহ ছাড়া আর কারাে নেই। সুতরাং কেউ যদি পীরের, বাবার ক্ষমতা আছে বলে মনে করে সে মুশরীক হয়ে যাবে। আর মুশরীকের ঠিকানা জাহান্নাম। ।
আটরশির আকীদা-বিশ্বাস নং- ৪
পীর দুনিয়াতে যাবতীয় মসিবত থেকে রক্ষা করতে পারেন। “শাহসূফী হযরত ফরিদপুরী (মা.জি.আ) সাহেবের নসীহত নামক গ্রন্থের ৬ষ্ঠ খন্ড ৩৬ নং পৃষ্ঠায় লিখা হয়েছে, মুরীদ পৃথিবীর যে স্থানেই থাকুক না কেন সেই স্থানেই তাহাকে যাবতীয় বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করতে পারেন। মুর্শিদে কামেলকে আল্লাহ এইরূপ ক্ষমতা দান করেন। শুধু মুরীদকেই নয় মুরীদের আত্মীয়-স্বজন, মাল-সামানা, ঘর-বাড়ী যাহা কিছুই খেয়াল করুক, তাহার সব কিছুই আল্লাহর কুওতের কেল্লায় বন্দী করিয়া দেন।
তার বিপক্ষে দলিলঃ আটরশির এ ধারণা সম্পূর্ণ কুরআন-সুন্নাহ পরিপন্থী ও জঘন্য কুফুরী মতবাদ। কেননা, আল্লাহপাক কাহরাে বিপদ-আপদের ফয়সালা করলে কেউ তাকে তা থেকে বিরত রাখতে পারে না। এমনকি বিশ্বনবী (সাঃ)ও সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী নন; বরং তিনি তার নিজের ক্ষতি ও লাভের ক্ষমতাও রাখতেন না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ রাব্বল আলামীন বিশ্বনবী (সাঃ) কে বলেন,
قل لن يصيبنا الا ما كتب الله لنا
অর্থঃ হে নবী আপনি বলে দিন, কখনাে আমাদের পৌছবে না, আল্লাহ তা’আলা আমাদের জন্য যা লিখে রেখেছেন তা ছাড়া। (সূরা তওবা আয়াত: ৫১)। কারাে কোন বিপদাপদ এলে আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ তা দূর করতে পারে না; একথা উল্লেখ করে আল্লাহপাক ইরশাদ করেন,
ان تمسك الله بضر فلا كاشف له الا هو
অর্থঃ আল্লাহ তাআলা যদি তােমাকে কোন ক্ষতি স্পর্শ করান, তাহলে তিনি। ব্যতিত তা দূর করার কেউ নেই। (সূরা ইউনুস, আয়াত: ১০৭) বিশুদ্ধ আকীদা হল, একমাত্র আল্লাহ তাআলাই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, বিপদ-আপদ থেকে রক্ষাকারী। কোন নবী-রাসূল, পীর-আউলিয়া কোন মানুষের উপকার-অনুপকার, মসিবত দূর করার ক্ষমতা রাখে না। এ মর্মে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেন
الا بشی بشي لم ينفع واعلم أن الأمة لو اجتمعت على ان ينفعو الا قد كتبه الله لك ولو اجتمعوا على أن يضروك بشئ لم يضرو بشئ قد كتبه الله عليت.
অর্থঃ জেনে রেখ! তােমার উপকার করার জন্য সমস্ত জাতি যদি একত্রিত হয়, তবে আল্লাহ্ তােমার জন্য যা লিখে রেখেছেন তা ছাড়া তারা তােমাকে কোন উপকার করতে পারবে না। আর তােমাকে কোন ক্ষতি করার জন্য যদি সমস্থ মানুষও একত্রিত হয়, তবে আল্লাহ যা তােমার উপর লিখে রেখেছেন তা ছাড়া তারা। তােমাকে কোন ক্ষতি করতে পারবে না। (মিশকাত, পৃষ্ঠা- ৪৫৩, তিরমিযী, খন্ড- ২, পৃষ্ঠা- ৭৮)। প্রিয় পাঠক! লক্ষ্য করুন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যেখানে মসিবত দূর করার বা , লাভ-ক্ষতির অধিকারী নন সেখানে আটরশির ভন্ডকে মসীবত থেকে রক্ষাকারী বলে বিশ্বাস করলে, আটরশির ভন্ডকে রাসূল (সাঃ) এর চেয়ে বড় মনে করা বৈ কিছু নয়। যা কুফুরের অন্তর্ভূক্ত।